ক বি-প্রা ব ন্ধি ক র ফি ক উ ল ই স লা ম

রফিক উল ইসলাম

জন্ম:আগস্ট ১৯৫৪।দক্ষিণ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: জলের মতো সুখে আছি(১৯৮৫), শব আর শব্দ ভৈরবী (১৯৮৯), মৈত্রেয় রাত্রির পথে(১৯৯৩), আমাদের বৃষ্টিপাতের মাঝখানে(১৯৯৭), সোনালি শিবির(২০০১), প্লাবনরেখা ছুঁয়ে(২০০১), ভিন গাঁয়ের কথাটি(২০০৫), জিয়ারত(২০০৯), অর্ধেক চাঁদের জন্যে(২০১২), আটাশ কিংবা ছাব্বিশ(২০১৪), The Magic Bridge (2014, 2nd edition ), শ্রেষ্ঠ কবিতা(২০১৫), অবসরের পর সেলফি(২০১৮), কবিতাসংগ্রহ(২০১৮/বাংলাদেশ থেকে)।ছোটোদের কবিতা: হাওয়ার কানে মেঘের দুল(২০১১)।বিশিষ্ট এই কবি ও গবেষকের ২০ টিরও অধিক গবেষণা ও সংকলনগ্রন্থ প্রকশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের  ১০০ টিরও অধিক সংকলনগ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে তাঁর কবিতা।সম্পাদিত পত্রিকা: গ্রামনগর (এখন বন্ধ)।

@কবির সঙ্গে,কবিতার সঙ্গে


র ফি ক  উ ল  ই স লা ম 

অনন্তবন্ধনের কবি: সুব্রত রুদ্র


পিঠের ওপর আছড়ে পড়ছে তুমুল অনুশাসন: 'দেখিস, সাবধানে টেনে বের করবি, যেন পাতা মুড়ে না যায়।অনেক অনেকদিনের পুরনো পত্রিকাগুলি, যেন মলাট খসে না পড়ে...'।

ঘরভর্তি তাকগুলিতে, আলমারিতে রাশি রাশি বই। এমনকি ফোল্ডিং খাটটার উপরেও, সেগুলি মেঝেতে নামিয়ে রাত্তিরে আমার শোওয়ার ব্যবস্থা। ভিতরের উঁচু তাকে থরে থরে পত্রিকা সাজানো।বহুদিনের পুরনো অথবা নবীন সব পত্রপত্রিকা। দীর্ঘদিনের আবদার করার পর সেই প্রথম অনুমতি পাওয়া।গভীর রাত। একটি টুলের উপর দাঁড়িয়ে আছি। টুল নাকি অনুশাসনের ওপর, বুঝতে পারছি না। শুধু এক অদ্ভুত শিহরণে কাঁপছি।

— ওই যে, ডানদিকের কোণ থেকে তৃতীয় সারির পর...

উত্তেজনায় হাত কাঁপছে আমার। ইপ্সিত পত্রিকারাশির ভিতর থেকে খুব আলতো করে একটি তুলে নিলুম। অল্প একটু ধুলো ঝরে পড়ল। ধুলো নাকি বনেদি কিছু অক্ষর, যা কোনওদিন পুরনো হবার নয়!

সেইসব মধ্যরাত, তাও প্রায় তিরিশ বছর আগে, এ-দিন থেকে ও-দিনে ডিঙিয়ে যাবার পথে পৃথিবী যেন থমকে যেত একটুখানি। সেই ফাঁকে, সেই প্রথম আমার 'কবিতা', কিংবা 'পূর্বাশা', কিংবা 'শতভিষা' কিংবা 'কৃত্তিবাস' ছুঁয়ে দেখা।

২

— পাতা মুড়ে গেলে কী হয়, কিংবা মলাটের একটুখানি খসে গেলে? বুকের কোথাও কি বাজে? কোথায়? লিখতে এসেছি, সদ্য পত্রিকা করতে এসেছি, একটুখানি খুলে বলুন।

— দ্যাখ, এই যে বইপত্তর,পত্র-পত্রিকা, ওগুলি তো কেউই মৃত নয়।প্রত্যেকটির ভেতর লেখক-কবিদের আত্মা চোখ মেলে আছে। তোকে লক্ষ করছে। মমতা না থাকলে স্থান পাবি কী করে? ওইসব আত্মাদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই তো জেগে থাকা, ঘুমোতে যাওয়া। তুই তো একা নোস, হাজার হাজার প্রাণ তোকে স্পর্শ করে আছে। মমতা না থাকলে তো হারানোকে জয় করতে পারবি না...

          আমি কি বুঝি ছাই এসব! এদিকে ওদিকে লেখা পাঠাই। ডাকে।গুটিকয়েক ছাপাও হয়ে যায়। ছাপা হয়ে যায় 'অমৃত' কিংবা 'দেশ' পত্রিকার পাতাতেও। এখন নিজেদেরই পত্রিকা করার বাসনা। 'কবিতা', 'পূর্বাশা', 'শতভিষা', কিংবা 'কৃত্তিবাস' সবই তো প্রবাদ হয়ে আছে। সেসব ইতিহাসও আমাদের মুখস্থ। হায়, আমরা যদি সেইসব ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারতুম! 

এরকমই এক দোলাচলের ভেতর ওইসব ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলিকে নিজের মতন করে উলটে পালটে স্পর্শ করার সুযোগ পেয়ে যাওয়া।

— দ্যাখ,পত্রিকা হল মিলনস্থল, সুন্দরের পুণ্যভূমি। নিজের কাছে দায়বদ্ধতা,নিষ্ঠা আর একাগ্রতা ছাড়া কোনও কিছুই করা যায় না। আর সাহিত্যে অথবা সম্পাদনায় তো বন্ধুকৃত্যের কোনও স্থান নেই...

কবি সুব্রত রুদ্রের বাসাবাড়িতে সেইসব গভীর রাতের স্মৃতি আজও বুকের ভেতর অমলিন আর জাগরিত হয়ে আছে।

৩

এইসব রাতকাহিনিরও একটি সূচনা পর্ব আছে। আমাকে পিছিয়ে যেতে হবে ৮৬/৮৭ সালের দিকে। তখন প্রকাশিত হয়ে গেছে আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থ "জলের মতো সুখে আছি" (১৯৮৫)। নকশাল আন্দোলন করতে গিয়ে জেলফেরত বন্ধুবর তপন গায়েনের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল বইটি, মলাট এঁকে দিয়েছিলেন স্বনামখ্যাত পূর্ণেন্দু পত্রী। পূর্ণেন্দুদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলুম আর এক ইতিহাসে। সে যাই হোক, বিশিষ্ট শিল্প সমালোচক সন্দীপ সরকারকে সঙ্গে নিয়ে সুব্রতদা আমাদের এখানকার একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন, ফলতার কাছাকাছি অঞ্চলে। সেখানেই প্রথম সাক্ষাৎ। আমার কবিতার বইটি দিয়েছিলাম ওনাকে। অনেকটা কথাবার্তার পর উনি বলেছিলেন, একদিন বাড়িতে আয়। তো বাড়িতে গেলাম একদিন, উনি থাকেন লেক গার্ডেন্সের কাছেই, সেখানেই গেলাম। সেদিন একথা সেকথার পর, বললেন যে, সুকুমার রায়ের ওপর ছড়া লিখে আন। লিখে নিয়ে গেলাম আরেকদিন।পছন্দও হল ওনার। তারপর উনি আমার পরবর্তীকালের লেখাগুলি দেখতে থাকলেন... দেখতেই থাকলেন বিভিন্ন দিনে, যখনই ওনার বাড়িতে যেতাম। একদিন হল কী, ওনার বাড়ি থেকে ফেরার পথে, ঝড়বৃষ্টিতে আটকে গেল ট্রেন। মগরাহাট স্টেশনের কাছাকাছি। সারারাত ট্রেনের ভিতরেই আটকে থাকতে বাধ্য হলাম আমি, পরেরদিন সকালে ফিরেছি ডায়মন্ড হারবার।পরের বার গিয়ে সুব্রতদাকে বললাম ঘটনাটি। উনি সব শুনে বললেন, তুই এবার যেদিন কলকাতায় আসবি, তোর আর রাতে বাড়ি ফেরার দরকার নেই, তুই আমার কাছেই থাকবি রাতে। সেই থেকে গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কলকাতা গেলে আমি ওনার কাছেই থাকি। আজও। আমার পরবর্তী জীবনের লেখালিখি কিংবা সম্পাদনাকর্মের সবকিছুই একটা 'ক' অক্ষর পর্যন্ত—মানে যেটকু শেখা,সবটাই কবি-গবেষক সুব্রত রুদ্রের কাছ থেকে। আজকের এই যে রফিক উল ইসলাম, এই যে আমার এত এত বই— আমার সমস্ত বইয়ের পাণ্ডুলিপি, কবিতা সাজানো, নামকরণ সবটুকুতেই ওঁর হৃদয়ের পরম স্পর্শ লেগে আছে। সুতরাং আমার কবিজীবনের যদি কেউ পিতা থাকে, তো এই একজন মানুষ। যিনি পিতা নাকি বন্ধু, দাদা নাকি দেবদূত বুঝে উঠতে পারিনি আজও!

৪

হীরককণার ওপর আলোর ঝিকিমিকির মতন কবি সুব্রত রুদ্রর কবিতা। বাহ্যিক রোশনাই-এ ধাঁধিয়ে দেয় না,অন্তর্গত দীপ্তিতে মোহময় করে রাখে। দীর্ঘকাল কবিতা লিখছেন, যিনি নুনের বদলে কবিতা মেখে নিয়েছিলেন ভাতে। তাঁর কবিতা তো জীবনধারণেরই অঙ্গ, বাঁচার, বেঁচে ওঠার অনন্ত প্রয়াসমাখা। যেখানে প্রাণ অথবা প্রাণহীনতার স্পন্দন, সে বৃক্ষ অথবা প্রাণীসকল, সে চিতা অথবা ঢাকের শব্দ, সবখানেতেই তাঁর অন্তর্ভেদী সংরাগ প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। মিথ থেকে মানবজীবন, জীবনের আকণ্ঠ ক্ষুধা, অন্ধকার ভেঙে উঠে আসা শান্ত গলি, সবই তাঁর কবিতার চরিত্র হয়ে ওঠে।

আদর্শলগ্ন,আকণ্ঠ প্রেমিক এই কবি, কতখানি ভালবাসতে জানেন, তা ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়। দেশ, কাল, কালের গণ্ডি অতিক্রম করে তিনি যেখানে পৌঁছে যান, 'প্রাণের ওপর অপ্রাণের সমস্ত দায়' বহন করার যে দুঃসাহস তিনি অর্জন করতে চান, তা যেন স্বপ্নময় আমাদের কাছে। একদিকে আগুনের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে তাঁর লাফিয়ে ওঠা,অন্যদিকে নৈঃশব্দ্যের সঠিক ভাষা খুঁজে বেড়ানো—এই দুই বিপরীত চরিত্র বুকে বেঁধে তাঁর যাবতীয় বিচ্ছুরণ।এই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপর নামকরণ 'বেঁচে থাকবে কেন' (১৯৮১), 'যমপুরীতে কবিতা' (১৯৮৫), 'হাসতে শিখেছে গম্বুজ' (১৯৯০), 'আত্মাহুতির দিন' (১৯৯৫) ইত্যাদি। নৈঃশব্দের সঠিক ভাষা খুঁজে ফেরার অপর নামকরণ 'গাঢ়তম ছায়া' (১৯৭৯), 'স্তব্ধতার পড়াশুনা' (১৯৮৪), 'জীবন্ত শাদা' (১৯৮৮), 'পিঠফেরানো ময়ূর' (১৯৯৪), 'জলফড়িঙের চোখে' (১৯৯৮) ইত্যাদি। আর প্রেম, দেশপ্রেম ইত্যাদির মগ্ন পাণ্ডুলিপির অপর নামকরণ 'আগুনে কে পোড়াবে তোমাকে' (১৯৯১), 'অন্ধ প্রেমিক' (১৯৯২), 'দেশ তো একটা বাড়ি' (১৯৯৭) ইত্যাদি। জীবন এবং জীবনের পার, জড়জগত এবং তাদের কোলাহল,সবখানেতেই যাঁর অবাধ বিচরণ, তাঁকে এমনভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয়তো সঠিক নয়। কেননা এই কবির সমস্ত কাব্যগ্রন্থগুলিতেই ছড়ানো আছে আগুন,তীব্র প্রেম,দেশাত্মবোধ আর জড়স্বরলিপির উন্মোচিত সুর। কোথাও পুরাকালের মিথ ভেঙে ভেঙে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে সময়ানুগ করে দিয়েছেন। দিয়েও তৃপ্ত হননি, নিজেই তার চরিত্র হয়ে উঠেছেন। কোথাও ক্ষুধিত জীবনের গল্পকথা, সেখানেও নিজেই চরিত্র সেসবের। এত এত বিচিত্র আর বহুগামী চরিত্রের দায় সামলানো এই কবিকে মুঠোয় ধরা অবাস্তব প্রায়। এত উন্মাদ, বর্ণময়, ভালবাসার বাউলটি যে রক্তাক্ত হবেনই, তা সংশয়াতীত। নিয়ত রক্তাক্ত হন বলেই নিয়ত আপন হয়ে ওঠেন। আর আপন হয়ে ওঠেন বলেই, আমরা তাঁর উজ্জ্বল পঙক্তিগুলির ভিতর নিজেদের প্রতিবিম্ব অহরহ দেখতে পাই। ২০১৮-তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর 'কবিতাসংগ্রহ' (২৬টি কাব্যগ্রন্থ একত্রে)।


তিনিই একমাত্র জীবিত কবি, যার কবিতাসংগ্রহের দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। সেখান থেকে একটুখানি টুকে দিচ্ছি: "... দেখার চোখে, মনের ছোঁয়ায় সর্বজাগতিক ভালোবাসায় জড়ানো বৈরাগী এক কবির একেবারে নিজস্ব ভাষার এই লেখাগুলি পড়তে পড়তে অনেক পাঠকেরই হয়তো মনে হবে: 'আধঘুমন্ত কবিতার গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে আছি।'...

৫

যখন তিনি ঝাঁপ দিয়েছেন আগুনে, কেমন হয় তাঁর পৃথিবী? মানুষের তাড়নায় প্রেত হয়ে ওঠেন, নাকি শ্মশান থেকে যে নদী সমতলে নেমেছে, তার নিচে দাউদাউ একা জ্বলে যান! কেউ তাঁকে পোড়ায়নি, তিনি নিজেই পুড়ছেন, যখন বিকেলের আলো ঘর ফাঁকা করে চলে গেছে। আর খিদে পেলে? সেও তো এক ধরনের পুড়ে যাওয়া। এই পুড়ে যাওয়ার কথা বারংবার তাঁর কবিতায় নানাভাবে এসেছে। মাটি ভরা কলসির সঙ্গে দড়ি বেঁধে কেন এত

উপোসের মাঝখানে তিনি ডুবে যান! "উনুনের দেবীর ভিতরের দিকে / রোজ একটা হাঁড়ি মাথা বের করে থাকত / হা অন্ন হা অন্ন / সেদ্ধভাত তোমার পাথর হয়ে যায়"। এর ভিতরেই বেঁচে থাকার মন্ত্র খোঁজা। না, হেরে যাওয়া নয়। জয়ের জন্য জীবন। ভিক্ষে করতে করতে হাতে কুষ্ঠ হয়ে যাক। তবুও জয়ের জন্য জীবন। ১৮৩০-এর বারাসাত, ৪০-এর ফরিদপুর বাখরগঞ্জ, ৭০-এর ভোজপুর কৃষকেরা— জয়ের জন্যে জীবন। কবি এরকম ভাবেন।

মানুষের পায়ের তলায় বসে, ছাত্রের মতন সবটুকু শেখা তাঁর।ইটের পাঁজর ফাটিয়ে কীভাবে বেড়ে ওঠে তৃণবালিকা! কবি তার সন্ধান পেতে চান। জ্বলন্ত চিতায় ছুঁড়ে দেওয়া নারী কীভাবে বেঁচে উঠবে আবার, কবি তার রহস্য খুঁজতে চান। অপমানে দগ্ধ, আর হাহাকারে ডোবা মানুষগুলি ভীত হয়ে আছে। কেন এমন ভীত হয়ে থাকবে মানুষ? " শহিদুল তোর কিসের ভয়? মুসলমানরা ভয় / পায় বলেই তাদের বেশি করে ভয় দেখাচ্ছে এদেশে"। কিংবা "ভূত মারে হিন্দু, ভূত মারে মুসলমান / শহিদুল ভূতের ভয় পেতে ভালোবাসিস না"। শ্মশান ডিঙিয়ে এসেছিলুম, এবার সন্ত্রাস ডিঙিয়ে যাব। কবি সঙ্গে আছেন। সবাই অন্যের জন্য সবখানেতে জেগে উঠব৷ এর নামই কি আত্মাহুতি? যদি তাই-ই হয়, তাহলে এই

কবির কাছে যে-কোনওদিন সকালবেলা আত্মাহুতির দিন। নিপীড়ন আর বঞ্চনার বিপক্ষে কবির রুখে দাঁড়ানোর দিন। এ সমাজে সর্বাপেক্ষা শোষিত নারীসমাজ। তাদের সপক্ষে কবির রুখে দাঁড়ানোয় ইতিহাস কথা বলে ওঠে, জলজ্যান্ত, কোনও ছলচাতুরী নিয়ে নয়। " হ্যাঁ হুজুর / আঠাশে মার্চ রাত্তিরে পঁয়ষট্টি বছরের ওসমানের / পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়েছি, আমি রমা মজুমদার / কেটেছি বেশ করেছি / কোনো কার্তিক চোখের সামনে আনবেন না"। বাংলা কবিতায় এ এক অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ, ইতিহাস ধরে ধরে, ভুল পৃষ্ঠাগুলির উপর চাবুক চালানো। কবিতায় এরকম দুরাশাই তিনি পছন্দ করেন।তাই তাঁর কবিতায় এসে যায় আজাদ কাশ্মীরের স্বপ্ন, কয়লাখনির ডুলি ওপরে ওঠার সময় কারা উঠতে পারছে না তাদের জন্যে উৎকণ্ঠা,  কিংবা সুন্দরবনের একটি মেয়ে কীভাবে সুন্দরীকাঠ হয়ে গেল, সেই লোককথার শিল্পরূপ। আর ইতিহাস যা গোপন করতে চায়, আড়াল করতে চায়,কবি তা খুঁটিয়ে তুলে আনেন তাঁর শিল্পময় রাগের সামনে।"নেতাজীকে লালকেল্লায় খুন— / আমি না, উষারঞ্জন বলেছে তার নিঃশ্বাস নিয়ে / জড়ো হওয়ার জন্যে"। কবি সুব্রত রুদ্রই লিখতে পারেন একথা। আধমরা মেয়ে কোলে বিধবার মতন চিৎকার করে উঠতে পারেন: " মাধব, মাধব, তোমার দেয়ালে ঘুঁটে দেব। / এই হল টিপনের ঘোড়া, চোখ দুটো খোলা"।

পুড়তে পুড়তে চোখ খুলে রাখেন কবি। সব অসম্ভব একদিন সম্ভব হবে। নর্দমার খাবার জল ফুরিয়ে গেলে, জ্যোৎস্নারা তা খুঁজতে বেরিয়ে পড়বে।পুনর্জন্ম টের পেয়ে যাবে নকল পয়সা। তাঁর সামনে খোলা আছে সমগ্র ইতিহাস। তাই এ-কবির কবিতায় ছড়িয়ে পড়ে উপেন্দ্রনাথ রায়, কিশোরীমোহন সরকার, কার্তিক শীল, কেশবচন্দ্র হাওলাদার, জীবনকৃষ্ণ, চারু মজুমদার, এমনকি "নিয়োগীর কথা"ও। তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে থাকে বিহারের দাঙ্গা, ভিন্দ্রানওয়ালে, সফদর হাসমির উৎসর্গীকৃত প্রাণের কথা।কোনও আত্মদানই তো বিফলে যাবার নয়।আর সমগ্র মানব জাতিকেই বুকের ভেতর জড়িয়ে রাখতে চান তিনি।তা কি বৃথা যেতে পারে? "বিন্ধ্যপর্বতের ওপারে নিশাবতী পাহারা দিচ্ছে অমল দিনগুলিকে / যাতে কেউ কিছু নোংরা করে না ফেলে" — এমনই সুদৃঢ় বিশ্বাস তাঁর। দেশপ্রেমের কথা উঠল যখন, প্রসঙ্গত বলি, তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থেরই শিরোনাম 'দেশ তো একটা বাড়ি'। সেখানে তিনি লিখছেন, "দেশ তো একটা বাড়ি যেখানে আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারব"। পারবেন কি কবি নিশ্চিন্তে থাকতে? সমগ্র মানবসত্ত্বার রোদন যাঁকে নিয়ত উন্মাদ করে তোলে, আধপোড়া করে তোলে, সেখানে নিশ্চিন্ততা কোথায়! তবুও এই স্বপ্নের মধ্যেই বেঁচে থাকুন তিনি। খুব বড় একটা বাড়ি। যেখানে এক ঝাঁকের যাওয়া, আর এক ঝাঁকের ফিরে আসা ভোর থেকে শান্ত মনে লক্ষ করুন তিনি...

পুনশ্চ: কবি সুব্রত রুদ্রকে একান্তভাবে ভালবেসে, তাঁকে উদ্দেশ্য করে কত যে প্রবীণ-নবীন কবি-শিল্পীগণ কলম ধরেছেন কবিতা/ছড়ায়, তার ইয়ত্তা নেই কোনো। বিগত কুড়িটি বছর ধরেই আমি সেইসব কাব্য গ্রন্থভুক্ত করে চলেছি। ইতিমধ্যে চারটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে তাঁকে নিবেদিত কবিতা/ছড়ায় সাজানো। প্রচ্ছদ সত্যজিৎ রায়ের।


 






Comments

Popular posts from this blog

কি ছু ব লা ক থা

ক বি অ মি ত গো লু ই