ক বি প্রা ব ন্ধি ক পা র্থ সা র থি গা য়ে ন

 

পার্থসারথি গায়েন

জন্ম:-৬ মে,১৯৫৩। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার উস্থি থানার গড়খালি গ্রামে। বর্তমানে কলকাতার ঢাকুরিয়া এলাকায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক।পরে ডব্লিউ বি সি এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরি ও খাদ্য দপ্তরের ডাইরেক্টর হিসেবে অবসর। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, নাটক,গল্প লেখায় তাঁর কলম সিদ্ধহস্ত।পুরস্কার ও সম্মাননা:- ভাষাবিদ ড. শহীদুল্লাহ স্মৃতি পুরস্কার, বনানী সাহিত্য পুরস্কার, পন্ডিত মদন মোহন তর্কালঙ্কার স্মৃতি পুরস্কার,বঙ্কিম সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলাদেশ থেকে পেয়েছেন একাধিক সাহিত্য সম্মাননা।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:-এসো হৃদয় খুঁড়ি,টাঁড় বনের উপকথা প্রভৃতি।

@কবির সঙ্গে,কবিতার সঙ্গে


পার্থসারথি গায়েন
 

সিসিপাসের স্বপ্ন:এক দগ্ধ ডানার উড়ান কাহিনী

'Emotion recollected tranquility' কবিতা সম্বন্ধে কথাগুলি বলেছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ। কবিতা হল আবেগ, অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের ছন্দবদ্ধ মিথস্ক্রিয়া।সংজ্ঞা যাই হোক, কবির মনের বাসনা যাই হোক, কবির কলমে বারবার উঁকি দেবে তার শিকড়, সমাজ ও সম্পর্ক। বারে বারে উঁকি দেবে তার জীবন আলেখ্য, জীবনের চর্যাপদ।

এই কবিতার উপজীব্য বিষয় অভিশপ্ত 'সিসিপাস'।ভাগ্য বিড়ম্বিত 'সিসিফাস'।দৈব বিড়ম্বিত 'সিসিফাস'। কী সেই অভিশাপ?বিশাল পাথরের চাঁই তুলতে হবে তাকে অমসৃণ পাহাড়ের চূড়াদেশে,কিন্তু চূড়াতে উঠবার আগে দুরন্ত পাথরের চাঁই আবার গড়িয়ে পড়ে যাবে তলদেশে।আবার তোলা—আবার পতন— আবার তোলা, আবারও…।

এই হল গ্রিক পৌরাণিক কাহিনী। কিন্তু এতে নতুনত্ব কোথায়? নতুনত্ব তার নির্মিতিতে, তার নির্মাণ কৌশলে।ভাবনার অভিনবত্বে। পরতে পরতে নতুনত্ব, অভিনবত্ব, নবদিক নির্দেশনা। কবি ফাল্গুনী ঘোষ গ্রিক পুরান থেকে কাহিনী নিলেন মিথকে ডিমিথ করে নতুন ভাবে তাকে উপস্থাপন করলেন। নিজের জীবনের রক্ত, কান্না, ঘামের সোঁদা গন্ধ মাখিয়ে তাতে দিলে নতুনত্বের স্বাদ। আমরা

দেখলাম মিথ ও চলমান জীবনের এক অন্তরঙ্গ যুথবদ্ধ যাত্রা। এ কবিতার অস্থির ভেতরে ইতিহাস চেতনা ও পুরাণগাথা মর্মে গাথা চলমান কাল। যন্ত্রণাদগ্ধ কাল। কবিতার ছত্রছত্রে ব্যথা, কান্না, ফোটা ফোটা চোখের জলের– রুদ্রাক্ষ। 

কবিতার প্রথম স্বর্গ শুরু হচ্ছে–" আমি সিসিফাস/ আমি একবিংশের সিসিফাস/ অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি এই নগরে"। কে সিসিফাস?পৌরাণিক সিসিফাস নয়। অনেক নগর- গ্রাম- শহর বিসর্পিল বনপথ পার হয়ে হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে এসেছে সিসিফাস। নতুন সিসিফাস। আলোর দীপ্তিতে দীপ্তমান সিসিফাস। আলোর দহনে দগ্ধ সিসিফাস। আশার বাতি জ্বালিয়ে সিসিফাস অনেক উজান পথ পেরিয়ে এসেছে আলো ঝলমলে নগরে। শুরু হবে তার স্বপ্নের উড়ান। ঠেলে তুলবে সে পাথরের বিশাল চাঁই পাহাড়ের চূড়ায়। শীর্ষ দেশে। নিজের স্বপ্ন সৌধকে তুলে ধরবে বাস্তবের নাচ দুয়ারে।

কিন্তু শহরের পথ পরিক্রমা করতে করতে সিসিফাস আঁৎকে উঠছে যন্ত্রণায়। ভয়ে। উদ্বেগে। এ কোন নগর সভ্যতা? এ কোন অভিশপ্ত জনপদ?কবির ভাষায়—" তেল চিটচিটে পড়া এ শহরের স্নায়ুতে কিলবিল করছে অজস্র উকুন/ ফুটপাতে ফুটপাতে জংঘা বিছিয়ে/ হাভাতে বেকার বাউন্ডুলে আগুন জ্বালিয়েছে/ তাদের পাকস্থলীর ক্ষুধার্ত সংলাপে…" জীবন যন্ত্রণার এক মর্মন্তুদ উপাখ্যান। শোক লহরী। নগর সভ্যতার নির্লজ্জ নগ্নতা।কবির শব্দের দহনে দগ্ধ সভ্যতার বিবর্ণ গাত্র চর্ম। 

কিন্তু কবির স্বপ্নের সিসিফাস তার উড়ান থামায়নি কোন দুঃসহ দৃশ্যে। কোন দুঃখময় অভিঘাতে। সে স্বপ্নের বীজ বয়ে নিয়ে চলেছে দূর থেকে সূদুরে। নগরে নগরে। বিজন প্রান্তরে। দ্বিতীয় স্বর্গে এসে সিসিফাস আত্মস্ত হয়ে স্বগোতক্তি করছে– "সিসিফাস/ মায়ের মত বুকে জড়িয়ে ধরে/ তুমি আজ সভ্যতার দুরন্ত অ্যাথলেট"। কিন্তু এসভ্যতা আমাদের শিখিয়েছে ভোগ, অনন্ত লোভী যক্ষের মতো উন্মত্ত আমাদের থাবা/ তার মধ্যে অসংখ্য অন্ধ ইঁদুরের কিচকিচ…"।

আমরা ভোগোলিপ্সু।ছুটে চলেছি দুরন্ত বেগে।দূর্দম আবেগে। রণোমত্ত, উদ্ভ্রান্ত আবেশে। আরো চাই, আরো চাই— আরো— আরো….

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় 'কী যে চায় নাহি জানে/ নাহি ঘুচে তৃষা/ আপনার মনোমাঝে আপন সে/ হারায়েছে দিশা/ বিকারের মরীচিকা জালে' ভোগের অনন্ত লালসা, অতৃপ্ত বাসনা তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে দিক থেকে দিগন্তরে। স্বার্থবাদী মানুষ দু'পায়ে দলিত মথিত করে চলেছে সুখ, স্বাচ্ছন্দ–স্নেহনীড়। অসহায় সিসিফাস উদভ্রান্ত পথের মাঝে পথহারা।

সিসিফাসের অজেয় স্বপ্ন নিয়ে চলতে চলতে তৃতীয় ধর্মের জায়গায় এসে কবি বলছেন, "আজ মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ঘরে ঘরে/ আমরা যতটা গ্লোবাল হয়েছি/ ততটাই বিচ্ছিন্ন হয়েছি একাকী হিমশৈলের মতো/ পরিবার ছোট হতে হতে আণুবীক্ষণিক/ দাম্পত্য ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দুলে যায়…"।


রংচংয়ে রাংতার জড়ানো আধুনিক সভ্যতার হৃদপিন্ডে যেন সশব্দে কুঠারাঘাত।এ সভ্যতার দেখানেপনা আছে, দরদ নেই।এ সভ্যতার শক্তি, দম্ভ আছে শ্রী নেই/ ধ্বংসের রণদামামা আছে ধী নেই/ অসংযমের বেলেল্লাপনা আছে হ্রী নেই/এ অসভ্যতার সম্পদ বেড়েছে সংকল্প মরেছে।এ সভ্যতার সমাজ মাধ্যমে যোগাযোগ আছে, অন্তরের সংযোগ নেই। হৃদয়ের চলাচল নেই। এসব ভাতা বন্ধ্যা নারী এসভ্যতা বীর্যহীন পৌরুষ!"

সিসিফাসের চারদিকে জীবন যন্ত্রণা। সভ্যতার সমারূঢ় সংকট।ভোগলিপ্সুর ভৈরব নৃত্য। তবু কিন্তু স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সিসিফাস স্বপ্ন হারা নন। দুঃখ -দৈন্যের নিরন্তর নিপীড়ন, দৈবের দুঃসহ পরিহাস ও অভিশাপের বন্ধুর পথ বেয়ে সিসিফাস চলেছে স্বপন বপন করতে করতে।

চতুর্থ অধ্যায়ের একেবারে উপান্তে এসে দেখি সিসিফাস স্বপ্নের সোনালী চোখ। যেন ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং-র 'লাস্ট রাইট টুগেদার'-র প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের সেই চিরন্তন আশাপূর্ণ বাণী–'Who knows but the world may end to night.' প্রত্যাখ্যান করেছ তো কি আছে– চলো তো আজ অন্তত ঘুরে আসি।কে বলতে পারে হয়তো এই রাত্রির শেষে ঘনিয়ে আসবে পৃথিবীর ইন্তেকাল। আশা–আশা। অনন্ত,অশান্ত জীবনের একান্ত ভরসা। কবি ফাল্গুনীর সিসিফাসের মগ্ন উচ্চারণ–" অলীক এ জীবনে ছোট ছোট মৌমাছির/ ফোকরে গিয়ে আলম্ব বিশ্রামে/ চোখের পাতার নীড়ে দেখি/ আগামী সকালের ব্যস্ত রোদ/ বেঁচে থাকার আরো এক চরম আকুতি"।

ধ্রুপদী শব্দের সুবাস নৃত্য। শব্দের চমক, ভাবের গমকে এক চঞ্চল চিত্রকল্প মূর্ত। বিভীষিকাময়, মৃত্যু, যন্ত্রণা,না পাওয়ার বিষম বেদনা ছাপিয়ে জেগে উঠেছে অনাবিল স্বপ্ন। বেপরোয়া সাধ। সোনালী সকালের হাতছানি। এখানেই জীবনের সার্থকতা।কবির কলমে জেগে উঠেছে আশাবাদের কল্পনালতা। জীবনের চলা শ্যামল শোভন রথে নয়। জীবনের চলা বকুল বিছানো পথে নয়। তবুও

চড়াই উতরাই পার হয়ে জীবন চলেছে হয়ে হয়ে। জীবন চলেছে হতে হতে। দুঃখ-মৃত্যু বিরহকে এড়িয়ে নয়, দুঃখ-মৃত্যু বিরহ পার হয়ে জীবন চলেছে আশালতার পথ বেয়ে। জীবন চলেছে পূর্ণতার পথে। জীবন যেন রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাইছে– 'আছে মৃত্যু, আছে দুঃখ বিরহ দহন লাগে/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে'।

কবির কলঙ্কিত কৃতবিদ্য। সফলকাম। স্বর ক্ষেপণে ও শব্দের অভিযোজনে কবির মুন্সিয়ানা প্রশংসারই। কিন্তু এখন প্রশ্ন এ কবিতা কী দীর্ঘ কবিতা না মহাকবিতা? দীর্ঘ কবিতা নয়,কেননা এ কবিতা সরলরৈখিক নয়,একরৈখিক নয়। অনেকে হয়তো একে মহাকবিতা বলতে ইতস্তত করবেন,কেননা এ কবিতার পাঁচটি স্বর্গ নেই। আছে চারটি স্বর্গ। 

আমার মত এ কবিতা বহুলাংশে মহাকবিতা। মহাকবিতায় যে পাঁচটি স্বর্গ থাকতেই হবে এমন কোন তর্কাতীত সংজ্ঞা হাতে আসেনি আজও। বস্তুতপক্ষে মহাকবিতার সঠিক সংজ্ঞা আজও নিরূপণ হয়নি ঠিকঠাকভাবে। কিন্তু এ কবিতা যেহেতু একরৈখিক নয়, এ কবিতা যেহেতু স্বর্গে বিভক্ত,কবিতায় যেহেতু ইতিহাস চেতনা, পুরাণগাথা, মর্মে আছে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। এ কবিতা যেহেতু বহুমাত্রিক তাই আমি একে আখ্যা দেবো মহাকবিতা বলে। কবির কলম আরো বল্লমের মতো তীক্ষ্ণধী হোক,স্রোতস্বিনী হোক।





Comments

Popular posts from this blog

ক বি-প্রা ব ন্ধি ক র ফি ক উ ল ই স লা ম

কি ছু ব লা ক থা

ক বি অ মি ত গো লু ই