ক বি-অ নু বা দ ক আ মী রু ল আ র হা ম
ফ্রান্সের Etoile de la SCAM পুরস্কৃত চলচ্চিত্রকার আমীরুল আরহাম প্যারিস প্রবাসী কবি। ফ্রান্স ও ইউরোপিয়ন টেলিভিশন সহ নানান দেশে তাঁর প্রচারিত ছবি পৃথিবীর বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে এবং পুরস্কৃত হয়েছে। ২০১৯ -এ ক্যান চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমা পসিটিভ সেকশনে তাঁর ছবি Social Business নির্বাচিত হয় এবং প্যারিস সহ ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। চলতি বছরে তাঁর শেষ ছবি Antemanha কোভিডের কারণে সম্প্রচারে ব্যহত হয়েছে। বর্তমানে তিনি প্রত্যাবর্তন ও ইন্টিগ্রেশন দুটি ছবির প্রস্তুতি পর্বে কাজ করছেন।
তাঁর Tiasci ক্লাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিদের নিয়ে প্রতি মাসের প্রথম বুধবারে কবিতার আড্ডা দিয়ে আসছিলেন বিগত দশ বছর ধরে। কোভিডের কারণে ক্লাবটির কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ আছে। তাঁর দুটি কাব্য গ্রন্থ, বৃষ্টিতে ভিজছি, দৃষ্টিতে তোমার সমুদ্র ছায়া, ফরাসী অনুবাদ শামসুর রাহমানের কবিতা, একটি গবেষণা গ্রন্থ « The Forgotten mother language » (Sorbonne Paris V) সহ চলচ্চিত্র ও শিল্প বিষয়ক বিভিন্ন লেখালিখি আছে।
ফ্রান্সের কবি জ্যাক প্রেভার ও কেনিয়ান বংশোদ্ভূত কবি ওয়ারসান শায়ারের কবিতার অনুবাদে কবি-অনুবাদক আমীরুল আরহাম।
জ্যাক প্রেভার (৪ফেভ্রুয়ারী ১৯০০- ১১এপ্রিল ১৯৭৭): শব্দে সহজ, ছন্দে মুক্ত, অকপট অকৃত্রিম, স্বকীয়তায় উজ্জ্বল জ্যাক প্রেভারের কবিতা, সঙ্গীত, ফ্রান্সে আজোবধি জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা ফ্রান্সের স্কুল কলেজে পাঠ্য। তাঁর কবিতা সুরারোপিত করেছেন বন্ধু জোসেফ কোসমা, অনেকেই গেয়েছেন বিশেষ করে ইভ মন্তো, জুলিয়েত গ্রেকো, ক্যাথরিন সোভাজ প্রমুখ। বিখ্যাত অনেক ছবির চিত্রনাট্যকার (যেমন Drôle de drame, Le jour se lève, Les Enfants du paradis etc), এবং সংলাপ রচয়িতা হিসেবে চলচ্চিত্রে মৌলিক অবদান রেখেছেন। নাট্যকার ছিলেন, শব্দ নিয়ে খেলেছেন (হমোফন) এবং কোলাজ করেছেন বেশ কিছু।
মানবতা ও মুক্ত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্যে যুদ্ধ, ধর্ম ও ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়েছেন। একজন বিপ্লবী, সুঋয়ালিস্ট কবি জ্যাক প্রেভারের লেখায় সমসাময়িক প্যারিসের জীবন এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর সমাজের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে।
দিনটি আজই, এখনই
জ্যাক প্রেভার
অনুবাদঃ আমীরুল আরহাম
দিনের খুব কম সময়ই শুরু হয়েছে অথচ ইতিমধ্যে সন্ধ্যা ছয়টা
সবেমাত্র সোমবার এলো এবং সেটি ইতিমধ্যে শুক্রবার...
এবং ইতিমধ্যে মাস শেষ...এবং বছরও শেষ প্রান্তে।
এবং ইতিমধ্যে আমাদের জীবনের ৪০, ৫০ বা ৬০ বছর গেলো কেটে...
এবং আমরা বুঝতে পারলাম যে আমরা আমাদের পিতামাতা, বন্ধুদের হারিয়েছি....
এবং আমরা বুঝতে পারলাম যে পিছনে ফিরে যেতে দেরি হয়ে গেছে খুব....
তাই চলুন, এতদসত্ত্বেও চেষ্টা করি, আমাদের ফেলে আসা পুরোটা সময় সদ্ব্যবহার করি
আসুন আমরা আমাদের পছন্দের কাজগুলো এখনই করতে চেষ্টা করি..
আসুন ধূসরতায় কিছু রং দিই...
আসুন জীবনের ছোট ছোট জিনিসগুলি নিয়ে হাসি যা আমাদের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে।
এবং সবকিছু সত্ত্বেও, যেটুকু সময় অবশিষ্ট আছে, আমাদের অবশ্যই শান্তির সাথে বাঁচতে হবে।
আসুন "পরে" মুছে ফেলার চেষ্টা করি
আমি পরে করবো
পরে বলবো
পরে ভাববো
আমরা পরের জন্য সবকিছু ছেড়ে দেই যেন "পর"ই আমাদের।
কারণ আমরা বুঝতে পারি না যে
পরে, কফি ঠান্ডা হয়ে যায়…
পরে অগ্রাধিকারের পরিবর্তন হয়...
পরে সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়...
পরে স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়...
পরে বাচ্চারা বড় হয়…
পরে বাবা-মা বৃদ্ধ হয়...
পরে প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে যায়...
পরে দিন রাত হয়ে যায়...
পরে জীবনের মৃত্য হয়...
আমরা এখন সেই বয়সে নেই যে আমরা আগামীকালের জন্যে অপেক্ষা করবো এবং যা এখনই করা দরকার
এবং তারপরে প্রায়শই অনেক দেরি হয়ে যায়....
তাই... চলুন আর ‘পরে’ কিছু না রাখি...
কারণ সবসময় পরের জন্যে অপেক্ষা করে, জীবনের সেরা মুহূর্তগুলি হারাতে পারি …
সেরা অভিজ্ঞতা…
সেরা বন্ধু…
সেরা পরিবার...
দিনটি আজই...
এখনই, এটাই মুহূর্ত...
কবি পরিচিতিঃ কেনিয়া বংশোদ্ভত বাবা-মার গর্ভে ওয়ারসান শায়েরের জন্ম ১লা অগাস্ট, ১৯৮৮ সোমালিয়ায়। ব্রিটিশ কবি,সম্পাদক ও শিক্ষক। ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আফ্রিকান পুরষ্কার এবং লন্ডন ইয়ং পোয়েট্রি পুরস্কার অর্জন করেছেন।
বাড়ি
ওয়ারসান শায়ার
অনুবাদঃ আমীরুল আরহাম
কেউ তার বাড়ি ছেড়ে যায় না
যদি না বাড়ি হাঙ্গরের মুখে প্রবেশ করে
তুমি সীমান্তের দিকে দৌড়াও
যখন তুমি দেখো সমস্ত শহর দৌড়াচ্ছে
তোমার প্রতিবেশী তোমার চেয়ে দ্রুত দৌড়াচ্ছে
ঊর্ধ্বশ্বাস কণ্ঠে তোমার রুদ্ধরক্ত
ঐ ছেলেটির সাথে তুমিও স্কুলে গিয়েছিলে
তোমাকে চুমু খেয়েছিল সে পুরাতন টিন ফ্যাক্টরির পিছনে
সেইই আজ তার চেয়ে বড় বন্ধুক নিয়ে তাকিয়ে আছে
তুমি তখনই বাড়ি ছেড়ে যাও
যখন বাড়ি তোমাকে আর থাকতে দেয় না
কেউ তার বাড়ি ছেড়ে যায় না
যদি না তার বাড়ি তাকে তাড়া করে
পায়ের তলায় আগুন
গরম রক্ত তোমার পেটে
তুমি রূপান্তর হও আরেক মানুষে
ঘাড়ের উপরে জ্বলন্ত ছুরির হুমকি অনুভব ক’রে
তুমি বেরিয়ে পড়
শেষ মুহূর্তেও জাতীয় সংগীত তোমার ঠোঁটে
মুহুর্তের মধ্যে তুমি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলো
বিমানবন্দরের টয়লেটে
তোমার গলায় ছেঁড়া পাসপোর্টের প্রতিটি কামড়
জানিয়ে দেয় তুমি আর ফিরে আসবে না কোনদিন।
তোমাকে বুঝতে হবে যে-
কেউ তাদের সন্তানদের নৌকায় ঠেলে দেয় না
যদি না সমুদ্রকে স্থলের চেয়ে নিরাপদ মনে হয়
ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে কেউ তাদের হাতের তালু পোড়ায় না
ওয়াগনের নীচে মৃত্যুর সাথে ঝোলে না
ট্রাকের পেটে দিনরাত শিশুর মতো কুঁকড়ে বাঁচে না
দীর্ঘ যাত্রায় নিউজপ্রিন্ট ছাড়া আর কিছুই থাকে না খাওয়ার
কিলোমিটারের পর কিলোমিটার গণনা করো সারাদিন
বেড়াজালের নিচে কেউ হামাগুড়ি দেয় না
কেউ মার খেতে চায় না
কারুর করুণাও পেতে চায় না
কেউ শরণার্থী শিবির স্বেচ্ছায় বেছে নেয় না
অস্তিত্বের জন্যে গর্ত খোঁজে না
দগ্ধ নগ্ন শরীর খুলে দেখাতে চায় না
আগুনে জ্বলতে থাকা শহরের চেয়ে
তথাপি কারাগার নিরাপদ
একজন কারারক্ষী
রাত্রিতে
ট্রাকের চেয়ে ভাল
বাবার বয়সের পুরুষকে তোমাকে সহ্য করতে হয়
চোখের জলকে নীরবে গিলতে হয়
এজন্য কোনও ত্বক যথেষ্ট সহনশীল নয়
অতঃপর:
ফিরে যাও নিগ্রো উদ্বাস্তু
নোংরা অভিবাসী
রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী
‘আমাদের দেশের রক্তচোষা
নিগ্রো ভিক্ষুক
বিকট দুর্গন্ধ
অসভ্য, বন্য
তোমরা নিজের দেশ বিষ্ঠায় ভরিয়ে
এখন দুর্গন্ধময় বাতাসে ভরাতে চাও আমার দেশ’
এই সব উচ্চারিত শব্দ
আক্রমণাত্মক মুখ
তোমার পিঠের উপর থেকে পিছলে যায়
কারণ ওদের মোলায়েম আঘাত,
তোমার কোন অঙ্গ ছিঁড়ে ফেলার চেয়েও নরম
দৈনন্দিন জীবনের অমর্যাদা তোমার সাথী
তোমার দুপায়ের মাঝখানে বাবার বয়সের চৌদ্দজন পুরুষের
যৌন লাঞ্ছনা তুমি গিলতে থাকো
ধ্বংসস্তূপের চেয়ে,
তোমার সন্তানের টুকরো টুকরো দেহের থেকেও সহজ
আপাতত, মনুষ্য মর্যাদার কথা ভুলে যাও
তোমার বেঁচে থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আমি বাড়ি যেতে চাই
কিন্তু বাড়ি একটি হাঙ্গরের মুখ
বাড়ি হয় বন্দুকের নল
কেউ তার বাড়ি ছেড়ে যায় না
যদি না তার বাড়ি তাকে তাড়া করে
কেউ বাড়ি থেকে বের হয় না
যদি না বাড়ি তাকে তাড়িয়ে নেয় তীরে
যদি না বাড়ি তাকে বলে
দ্রুত পা চালাও-
তোমার কাপড় ছেড়ে যাও
মরুভূমিতে হাঁটু গেড়ে হাঁটো
মহাসাগরে সাঁতার কাটো
ডুবে যাও
বেঁচে থাকার যুদ্ধ করো
অনাহারে মরো
ভিক্ষা করো
অহংকার ভুলে যাও
তোমার বেঁচে থাকা কোন কিছুর থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ
কেউ তার বাড়ি ছেড়ে যায় না
যতক্ষণ না বাড়ি তোমার কানে ফিসফিসিয়ে বলেঃ
আমার কাছ থেকে পালিয়ে যাও, পালাও!
আমি জানি না আমার কি হয়েছে
কিন্তু আমি জানি, যে-কোন জায়গা
এখানের চেয়ে ভাল। পালাও!


খুব সুন্দর।
ReplyDelete